ধর্ষণ ও আইনি পর্যালোচনা

0
270
ধর্ষণ ও আইনি পর্যালোচনা

দর্শন: বর্তমান সময়ের সব থেকে আলোচিত বিষয় হচ্ছে ধর্ষণ। ধর্ষণ এবং ধর্ষণের সাথে জড়িত বেশ কিছু বিষয়ের উপর একটি আইনি আলোচনা করাই এই লেখার উদ্দেশ্য। লেখাটিতে প্রধানত ধর্ষণের ব্যাপারে বাংলাদেশের আইনে বর্ণিত বিধানগুলো এবং উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত গুলো আলোচনা করা হবে। তবে কিছু ক্ষেত্রে বাহিরের দেশের  উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত গুলোর আলোকে ধর্ষণের বিভিন্ন উপাদান গুলো বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হবে।

ধর্ষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাধারণ আইন ছিলো “দন্ডবিধি -১৮৬০”। সেখানে ধারা ৩৭৫ এ ধর্ষণকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং ধারা ৩৭৬ এ ধর্ষণের শাস্তি বর্ণনা করা হয়েছিলো।পরবর্তীতে ২০০০ সালে নারী ও শিশুদের উপর ক্রমবর্ধমান সহিংসতা রোধে “নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ ” নামে একটি বিশেষ আইন করা হয়।আইনের নীতি অনুযায়ী কোন বিষয়ের উপর যখন সাধারণ আইন ও বিশেষ আইন থাকে তবে বিশেষ আইনে বর্ণিত বিধান গুলো ঐ বিষয়ের উপর কার্যকর হবে।

এখানে উল্লেখ্য যে, দন্ডবিধি, ১৮৬০ এর ধারা ৩৭৫ এ ধর্ষণের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এ কিছু  পরিবর্তন সাপেক্ষে উক্ত সংজ্ঞাকেই গ্রহণ করেছে। “নারী ও শিশু ও নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ ” এর ধারা ২ এর উপধারা (ঙ) তে এ ব্যাপারে বলা হয়েছে- ধর্ষণ অর্থ এই আইনের ধারা ৯ এর বিধান সাপেক্ষে “দন্ডবিধি -১৮৬০” এর ধারা ৩৭৫ এ সংজ্ঞায়িত ধর্ষণ। মোদ্দা কথা এই আইনের ধারা ৯ এ কিছু পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে, যেগুলো পূরণ করে “দন্ডবিধি, ১৮৬০” এ র ধারা ৩৭৫ এ  ধর্ষণের  যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তা ই গৃহীত হবে।

দন্ডবিধি, ১৮৬০ এর ধারা ৩৭৫ এ ধর্ষণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, কোন পুরুষ নিম্নোক্ত পাঁচটির যে কোন অবস্থায় কোন নারীর সহিত যৌনসঙ্গম   করলে  সে ধর্ষণ করেছে বলে গন্য হবে।

প্রথমত, স্ত্রীলোকটির ইচ্ছার বিরুদ্ধে

দ্বিতীয়ত, স্ত্রীলোকটির সম্মতি ব্যতিরেকে উল্লেখ্য যে, আপাতদৃষ্টিতে ‘স্ত্রীলোকটির ইচ্ছার বিরুদ্ধে’ ও ‘স্ত্রীলোকটির সম্মতি ব্যতিরেকে’ একই মনে হলেও এদের মধ্যে বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য রয়েছে।যেমন, কোন এক স্ত্রীলোককে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে মাদক দ্রব্য ভক্ষণ করানো হলো। পরবর্তীতে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সে যৌনকার্যে সম্মতি দিল।এক্ষেত্রে তার সম্মতি থাকলেও তার প্রকৃত ইচ্ছা ছিল না।

তৃতীয়ত, স্ত্রী লোকটির সম্মতিক্রমেই,যেক্ষেত্রে মৃত্যু বা জখমের ভয় প্রদর্শন করে সম্মতি আদায় করা হয়।

চতুর্থত, স্ত্রীলোকটির সম্মতিক্রমেই, যেক্ষেত্রে পুরুষটি জানে যে, স্ত্রীলোকটি তাকে এমন একজন পুরুষ বলে ভুল করছে, যে পুরুষটির সাথে সে আইন সম্মত বিবাহিত হয়েছে বা বিবাহিত বলে বিশ্বাস করে।

পঞ্চমত, স্ত্রীলোকটির সম্মতিক্রমে বা সম্মতি ব্যতিরেকে, যদি স্ত্রীলোকটির বয়স চৌদ্দ বৎসর এর কম হয়।এছাড়াও ধারাটিতে যৌনসঙ্গমের একটা ব্যাখ্যা রয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে।যেখানে বলা হয়েছে – ‘ধর্ষণের অপরাধের জন্য আবশ্যকীয়  যৌনসঙ্গমের জন্য যৌনাঙ্গ প্রবিষ্ট করাই যথেষ্ট হইবে’। অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ সঙ্গমকালীন সময় সম্পূর্ণ হোক বা না হোক, নারী যৌনাঙ্গে পুরষাঙ্গ প্রবেশ মাত্রই ধর্ষণ হয়েছে বলে গন্য হবে। ধারাটিতে একটি ব্যতিক্রম অবস্থার কথাও বলা হয়েছে, “স্বীয় স্ত্রীর সাথে যৌন স ঙ্গমের ক্ষেত্রে স্ত্রীর বয়স যদি তের বছরের কম না হয় তবে তা ধর্ষণ হবে না। অর্থাৎ বৈবাহিক  সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্ত্রী যদি তের বছরের কম না হয় তবে পূর্বে আলোচিত পাঁচ অবস্থার কোন অবস্থায় পড়লেও তা ধর্ষণ হিসেবে গন্য হবে না।

“নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন,২০০০” এর ধারা ৯ অনুযায়ী ধর্ষণ হলো ‘যদি কোন পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ষোল বৎসরের  অধিক বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তাহার সম্মতি আদায় করিয়া অথবা ষোল  বৎসরের কম বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার  সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন, তাহা হইলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলিয়া গন্য হইবেন’।

বর্তমান আইন অনুযায়ী ১৬ বৎসরের নিচে কোন নারীর সাথে তার সম্মতিসহ যৌনসঙ্গম করলেও তা ধর্ষণ হিসেবে গন্য হবে।

সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ধর্ষণের ক্ষেত্রে সম্মতির বিষয়টি স্পষ্ট  করেছে। যদি পুরুষ ও নারীর মধ্যে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে যৌন সম্পর্ক স্থাপিত হয় তবে তা ধর্ষণ নয়। অর্থাৎ ধর্ষণের সর্বাধিক গুরুত্ববহ উপাদান হলো “সম্মতি”। স্বাভাবিকভাবেই যখন কোন পুরুষ তার কাম চরিতার্থ করার জন্যে কোন নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক যৌনসম্পর্ক স্থাপন করে, তবে তা ধর্ষণ। তবে সমস্যার সৃষ্টি হয় সম্মতিকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় স্ত্রীলোকটির সম্মতি আছে।যেমন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোন নারীকে নেশা দ্রব্য গ্রহন করানোর ফলে  সে ভারসাম্য হারিয়ে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করল। এক্ষেত্রে কী ওই নারীর সম্মতি আছে বলে ধরা হবে?অথবা কোন অপ্রকৃতিস্থ নারী যদি যৌনসঙ্গমে সম্মতি দেয় তবে কী ধর্ষণ হবে?

R vs Bree [200 ] EWCA 256  কেসে কোর্ট সম্মতি প্রদানের সময় সম্মতিকৃত বিষয়টি ব্যক্তির বোঝার ক্ষমতায় ছিলো কি না এবং ব্যক্তির যৌক্তিক আচরণ করার ক্ষমতা ছিলো কি না তা বিবেচনায় এনেছিলো।

অর্থাৎ অনিচ্ছাকৃত প্রমত্ততা বা অপ্রকৃতস্থ হওয়ার কারণে বিচারশক্তি রহিত ব্যক্তির সম্মতিকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে ধরা হবে না।

সম্মতি প্রদানের এই সূত্র ধরে বর্তমান সময়ের আলোচিত ‘বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ’ বিষয়টি বিশ্লেষণ করা যাক। সাধারণত পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে যৌনসম্পর্ক স্থাপনকে আইনে ধর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয় না। মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য-শারীরিক চাহিদা থেকে দুই পক্ষ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে।

মোদ্দা কথা হলো, স্বাভাবিকভাবে ধর্ষণের ক্ষেত্রে যেমন এক পক্ষের চাহিদাকে অপর পক্ষের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, এক্ষেত্রে কিন্ত তা হয় না।বাংলাদেশের উচ্চ আদালত ঠিক এই বিষয়টিকে ভিত্তি করেই লুকাস মিয়া বনাম রাষ্ট্র ৪৩ ডি এল আর ২৩০ এবং মানোয়ার মল্লিক বনাম রাষ্ট্র মামলায় রায় দিয়েছে। সেখানে ষোল বছরের উর্দ্ধের মেয়ের সাথে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শারীরিক সম্পর্ক করার ক্ষেত্রে ধর্ষণ হবে না বলে সিদ্ধান্ত  দিয়েছে। আইন সাধারণত নিজের ক্ষতি নিজে স্বীকার করার ক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে কোন প্রতিকার দিতে চায় না।

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও প্রথম দিকে এরকম মনোভাব প্রকাশ করত।তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের কোর্ট পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের আর্থ-সামাজিক মর্যাদা ও বিবাহের গুরুত্ব বিবেচনা করে “সম্মতি” ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে উদারপথ অবলম্বন করেছে। Praumoud Suryabham pawar vs The State &Anr (Criminal Appeal No. 1165 of 2019)  কেস এ জাস্টিস চন্দ্রচূড়  এবং জাস্টিস ইন্দিরা ব্যানার্জি ‘মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ‘(false promise) এবং ‘প্রতিশ্রুতি ভংগ’ (breach of promise) এর উপর তুলনামূলক পার্থক্য করে ‘মিথ্যা প্রতিশ্রুতির’ ক্ষেত্রে ধর্ষণ হবে বলে রায় দেয়। প্রতিশ্রুতি প্রদানের সময় পুরুষ সঙ্গীর মানসিক অবস্থা কী ছিল তা ই এখানে মূল বিবেচ্য বিষয়। অর্থাৎ পুরুষ ব্যাক্তির প্রাথমিক উদ্দেশ্যই যদি থাকে প্রতারণা করে নারীর কাছ থেকে সম্মতি আদায় করা তবে তা ধর্ষণ হবে। তবে প্রতিশ্রুতি প্রদানের সময় পুরুষ ব্যক্তির উদ্দেশ্য সৎ ছিলো, পরবর্তীতে কোন কারণে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হয়, তবে তা ধর্ষণ না।

উদাহরণস্বরুপ ভারতের একটি কেস উল্লেখ করা হলো, যেখানে বিবাহের শর্তের উপর পারস্পরিক সম্মতিতে যৌন সম্পর্ক স্থাপিত হয়। পরবর্তীতে মেয়ে নিম্ন বর্ণের হওয়ায় ছেলের পরিবার সম্পর্কটা মেনে নেয় না।পরিপ্রেক্ষিতে মেয়ে মামলা করলে হাইকোর্ট এখানে ধর্ষণ হয় নি বলে রায় দেয়। অন্যদিকে প্রতিশ্রুতি প্রদানের সময় যদি পুরুষ ব্যাক্তির অন্যায় উদ্দেশ্য থাকে  এবং প্রতারণার মাধ্যমে সম্মতি আদায় করে তা ধর্ষণ।

এখানে উল্লেখ্য যে, প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত সম্মতি আইনের দৃষ্টিতে অকার্যকর। (ধারা ৯০, দন্ডবিধি -১৮৬০)। ‘বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ’ এর ব্যাপারে মুম্বাই এর একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে -বিয়ের প্রলোভনে যেসব ধর্ষণের অভিযোগ আসে, তার অনেকেই আসে সামাজিকভাবে পিছিয়েপড়া দরিদ্র নারীদের পক্ষ থেকে। তাদের মিথ্যা লোভ দেখিয়ে ধর্ষণ করা হয়। অনেকেই আবার সন্তান সম্ভবাও হয়ে পড়েন’।


এছাড়াও কিছু ক্ষেত্রে নারীর আচরণের উপর ভিত্তি করে যৌনসঙ্গমে সম্মতি আছে বলে কোর্ট ধরে নেয়। যেমন সোহেল রানা বনাম রাষ্ট্র ৫৭ ডিএলার ৫৯১ মামলায় উল্লেখ আছে যৌনকর্মের সময়  স্ত্রীলোকটি কোনরূপ বাধা না দেয় অথবা বাধা দেয়ার চেষ্টা না করে অথবা কোন চিৎকার না করে তাহলে ধর্ষণ হয়েছে বলে মনে করা যাবে না। এসব ক্ষেত্রে স্ত্রীলোকটির সম্মতি আছে বলে ধরে নিতে হবে।

সর্বশেষ বলা যায়, নারীর অধিকার নিশ্চিত করণে ধর্ষণের সংজ্ঞার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। এতে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের অধিকার কিছুটা হলেও নিশ্চিত হবে।


লেখক: পিয়াল মাহমুদ
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here