মানবাধিকার দিবস পালন নয়, বাস্তবায়ন প্রয়োজন

0
169

প্রতি বছর দশই ডিসেম্বর বিশ্ব মানবাধিকার দিবস সমগ্র বিশ্বে পালিত হয়। খুব বেশিদিন নয় ১৯৪৮ সালে ১০ই ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকে দিনটি দিবস হিসেবে পালন করা নেয় জাতিসংঘ। কিন্তু মানব সভ্যতার বিকাশ ও বিস্তৃত হয়েছে অনেক আগে থেকে । তাহলে মানুষের মনে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন এসে যায় যে আগে কি মানবজাতির জন্য মানবাধিকার তথা Human Rights ছিল না ? বর্তমানে মানবাধিকার সনদে, সংবিধানে ও বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে মানবাধিকারের কথা বলা হলেও বাস্তবায়নের প্রেক্ষাপটে আশানুরূপ ফল আসে না। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো , যারা অর্থনীতিতে দূর্বল , তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও প্রকট হয়ে থাকে । কেননা মানবাধিকার প্রয়োগের পূর্বে জানা প্রয়োজন যার অধিকার সে তার অধিকার সম্পর্কে কতটুকু অবগত আছে । যেখানে মানুষ নিজেই সচেতন নয় সেখানে আরও মানবাধিকার পরের বিষয়।

মানবাধিকার বিষয়টি নিয়ে কথা বললে যে বিষয়টি প্রথমে আসে তা হল অধিকার অর্থাৎ মানবজাতির প্রত্যেকের কিংবা সম্মিলিত ভাবে অধিকার। অধিকার বিষয়ে নির্দিষ্ট সংজ্ঞা প্রদান কষ্টসাধ্য কাজ কারণ অধিকারের ব্যাপকতা অনেক। কিন্তু সাধারণ দৃষ্টিকোণ বলা যেতে পারে মানুষের স্বাভাবিক ভাবে জীবন ধারণা জন্য যা যা প্রয়োজন তাই অধিকার। তাহলে এখানে বিষয়টি দাড়ায়  মানুষের স্বাভাবিক জীবন ধারণের জন্য কি কি প্রয়োজন ? ব্যক্তিভেদে, স্থান ভেদে, জাতি ভেদে ও চাহিদা বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। মানুষের চাহিদার শেষ নেই। তবে অধিকারকে দুই ভাগে করা যায় : নৈতিক অধিকার ও আইনত অধিকার।
নৈতিক অধিকার হল মানুষের নৈতিকতা ও প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের বোধ থেকে যে অধিকার জন্মে। এর সাথে ধর্মীয় রীতিনীতি ও জড়িত আছে। আর আইনত অধিকার হল যে সকল অধিকার আইন প্রণয়নে মাধ্যমে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং যে বাস্তবায়ন করতে আইন কর্তৃপক্ষ বাধ্য সেগুলোই আইনত অধিকার। উদাহরণ দিয়ে বলা যায় যে আমাদের দেশে মত প্রকাশ করা  আইনত অধিকার তথা মৌলিক অধিকার এবং কেউ যদি এতে বাধাগ্রস্ত করে তবে সে অপরাধী হবে এবং শাস্তি পাবে।

মানবাধিকার ঘোষণা সনদে ২৫ টি মানবাধিকারের কথা বলা হয়েছে যার মধ্যে ১৯ হল পৌর ও রাজনৈতিক অধিকার এবং বাকি ৬ টি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার। এগুলোকে আইনত অধিকার সম্পূর্ণ রূপে বলা যায় না কারণ প্রত্যেক রাষ্ট্রই স্বাধীন ও সার্বভৌম। সুতরাং রাষ্ট্র কর্তৃক তৈরিকৃত সংবিধানে বা অন্য আইনে যে বিষয়গুলো থাকবে কেবল সেগুলোই হবে আইনত অধিকার এবং তা জনগণের জন্য রাষ্ট্র বাস্তবায়ন করতে বাধ্য। সংবিধান লিপিবদ্ধ থাকলে সেটাকে সাংবিধানিক অধিকার বলা হয়।  বাংলাদেশের সংবিধান যে সকল অধিকারের কথা হয়েছে সেগুলো বলা হয় মৌলিক অধিকার ( Fundamental rights, অনুচ্ছেদ ২৭ থেকে ৪৪ মোট ১৮ টি মৌলিক অধিকার। ) এগুলোর যে কোনো একটি খর্ব হলেই যে কেউ বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৪ (১) অনুচ্ছেদ ক্ষমতা বলে ১০২ (১) অনুযায়ী বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট কোর্টে মামলা তথা রিট ( writ ) করতে পারবে । কিন্তু বাস্তবতা হল এমন বহু ঘটনা সামনে কিংবা খবরে আসে যেখানে দেখা যায় যে মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন হয়েছে কিন্তু জনগণের অসচেতনতার ফলে আইনত ব্যবস্থা নেওয়া হয় নাই । আদালতের আদেশের পরেও বাস্তবতায় মানুষ কতটুকু অধিকার পায় তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়।

মানবাধিকারের বিষয়বস্তু পৃথিবীতে একদিনে আসে নাই। প্রত্যেক মানুষই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে এবং সমাজে মিলে মিশে বেচে থাকে এবং শেষে মারা যায়। সমাজ নিয়মকানুন অনুযায়ী বেচে থাকতে হয়। আদিম সমাজের মানুষজন অনেক বর্বর ছিল যার কারণে সেখানে বেচে থাকাই দায় ছিল আর মানবাধিকারের চিন্তা করাও আতঙ্ক ছিল। তবে যদি ইসলামিক ইতিহাস দেখা হয় তবে সেখানে বিদায় হজ্জে ইসলাম ধর্মে প্রচারক মহানবী ( সাঃ ) দাস ও দাসিদের অধিকার কথা বলেছেন। কারণ এর পূর্বে দাস ও দাসীদের সাথে অমানবিক আচরণ করা হত এবং তাদের কোনো অধিকার ছিল না । এছাড়া আরও অনেক অধিকারের কথা কুরআন ও হাদীসে বলে দেওয়া আছে। অন্যান্য ধর্মগ্রন্থেও মানুষের অধিকার কথা  বলা আছে। ধর্মীয় ক্ষেত্রে প্রয়োগ হলেও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সেটা হয় না।

কিন্তু এতকিছুর পরেও এত পরে মানবাধিকারের সার্বজনীন স্বীকৃতি এসেছে। কারণ শাসকগোষ্ঠীর হাতে থেকে দীর্ঘ সময়ের সংগ্রামের পরে সেটা আদায় করতে হয়েছে । পূর্বে রাষ্ট্র ব্যবস্থার অবস্থা ছিল sovereignty’s command is law মানে শাষকের আদেশই আইনে। সেখানে মানবাধিকার তথা মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলা যেত না। সহজ ভাষায় বলা যায় জোর যার মূল্লক তার। শাসকগোষ্ঠীর এমন আচরণের ও কারণ আছে আর তা হলে জনমনে অধিকারের বিষয়ে দাবি আসলে শাসকের শাসনব্যবস্থায় তার নিয়ন্ত্রণ থাকবে না অর্থাৎ শাসক যেটা চাইবে সেটা হবে না বরং জনগণ যেটা চাইবে সেটা হবে। এর ফলে এমনও হয়েছে যে শাসকগোষ্ঠীর পতন হয়েছে। যদি বৃটিশ সাম্রাজ্যের বিষয়ে দেখা হয় তবে ১২১৫ ম্যাগনা কার্টা ( Magna Carta) বিল থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে বিল অব রাইর্টস ( Bill of Rights )  ও এছাড়াও আরও  অাইন পাশের ফলে আসতে আসতে ব্রিটিশ জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী ব্রিটিশরাজ পরিবারের ক্ষমতা এসেছে ব্রিটিশ জনগণ তথা জনপ্রতিনিধিদের হাতে। মানবাধিকারের সাথে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।

বর্তমানে পৃথিবীতে অনেক মানুষই নিজের অধিকারে সচেতন । তবে তৃতীয় বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের জনগণ উন্নত বিশ্বের জনগণের মত সচেতন নয়। সাধারণত বাংলাদেশের জনগণ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থাণ, শিক্ষা ও চিকিৎসাকে মৌলিক অধিকার ভেবে থাকে। কিন্তু এগুলো হল জীবন ধারণের মৌলিক চাহিদা যেগুলো মৌলিক অধিকারে নয় বরং সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল  ( Fundamental principal of state policy ) নীতিমালার মধ্যে অন্তর্গত। উদাহরণস্বরূপ ভাবে বলা যায় মৌলিক অধিকারের একটি হল আইনের দৃষ্টিতে সমতা যেটি মানবাধিকার ও বটে। কিন্তু বাস্তবতার প্রেক্ষাপট আইনের দৃষ্টিতে সমতা দেখা যায় না। কারণ সমাজ ব্যবস্থাই এমন ভাবে প্রতিষ্ঠিত যে ধনীদের বিষয় আইনত অধিকার পাওয়া সহজ হয়ে যায়। বাংলাদেশে সরকারি ভাবে মানবাধিকার বিষয়ের জন্য রয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং বেসরকারি ভাবে রয়েছে অনেকগুলো মানবাধিকার সংস্থা। চারদিকের প্রেক্ষাপট পর্যবেক্ষণেই বুঝা যায় সংস্থাগুলোর কার্যক্রমের অবস্থা। পরিশেষে একটি কথা বলা প্রয়োজন যে যার মাথা ব্যাথা সেই ওষুধ খোঁজে। সুতরাং মানবাধিকার দিবস পালনের মধ্যে নয়, বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

লেখক,
জিসান তাসফিক।
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ,
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।
Email : zeesuntasfiq9314@gmail.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here