30 C
Dhaka
সোমবার, নভেম্বর ৩০, ২০২০
Home শিল্প-সাহিত্য ফিচার ডেস্ক লাল জামা | অ্যালিস মানরো

লাল জামা | অ্যালিস মানরো

আমার মা আমার জন্য একটি জামা তৈরি করছিলেন। পুরো নভেম্বর মাস জুরে স্কুল থেকে ফিরে আমি তাঁকে রান্নাঘরে লাল মখমলের কাপড়টাকে কাটা ছেঁড়া করতে দেখতাম। সেখানে তিনি একটি পুরানো সেলাই মেশিনে কাজ করতেন যেখানে জানালা থেকে আলো পাওয়া ছিল কষ্টসাধ্য। এর পাশাপাশি তাঁকে খড়ের ক্ষেত ও সবজি বাগানের দিকে লক্ষ্য রাখতে হত। রাস্তা দিয়ে কে যাচ্ছে তা তিনি দেখতে পেতেন তবে তা মাঝে মাঝে।

লাল মখমলের কাপড়টিতে কাজ করা কষ্টকর ছিল, এবং আমার মা কাজের জন্য যে ধরনটি বেছে নিয়েছিলেন তা সহজ ছিল না। তিনি ভাল সেলাই জানতেন না তবে তিনি বিভিন্ন জিনিস তৈরি করতে পছন্দ করতেন; এটা ছিল ভিন্নতর। উদাহরণ স্বরূপ তিনি সেলাইয়ের সূক্ষ্ম বিন্দু, বোতামের গর্তগুলির সমাপ্তির কাজগুলো এড়িয়ে যেতে চাইতেন । তাই আমার চাচী এবং আমার দাদী তাকে নিয়ে খুব একটা গর্বিত নন। তাঁদের সমালোচনার বিপরীতে আমার মা অনুপ্রেরণা, সৎ সাহস এবং ভাসমান ধারণার সাথে কাজ শুরু করেছিলেন; ঠিক সেই মুহুর্ত থেকে তাঁর জীবন থেকে আনন্দ কিছুটা লোপ পায়। প্রথমে তিনি তাঁর পছন্দমত কোনও নকশা খুঁজে পান নি। এতে অবাক হওয়ার কিছু ছিল না; তাঁর চিন্তার সাথে তাঁর কজের ধরনের মিল হচ্ছিল না। যখন আমি ছোট ছিলাম বেশ কয়েকবার তিনি আমাকে ভিক্টোরিয়ার স্টাইলের মত উঁচু গলাযুক্ত এবং অসমতল লেইসযুক্ত একটি ফুলের মত কোমল জামা সাথে একটি টুপি, মখমলের একটি জ্যাকেট, স্কটল্যান্ডে প্রচুর ব্যবহৃত মোটা কম্বল জাতীয় পোশাক এবং একটি সেলাই করা গ্রামীণ ব্লাউজ তৈরী করে দেন যা ছিল কালো জরিযুক্ত এবং যার প্রান্তদ্বয় ছিল লাল। সেদিনগুলিতে সেই জামাগুলো আমি আনন্দের সাথে পরতাম । তখন আমার বৈশ্বিক মতামত সম্পর্কে ধারণা ছিল না।

এখন আমি অনেক বুদ্ধিমান, আমি চাই আমার বন্ধু লোনির মত জামা যা সে শহরের নামকরা দোকান বেল’স থেকে কিনেছে।আমাকে চেষ্টা করতে হবে। মাঝে মাঝে লোনি স্কুল থেকে আমার সাথে আমার বাড়ি আসত এবং সে সোফায় বসে বসে নজরদারি করত। আমি বিব্রত হতাম যখন হঠাৎ আমার মা আমাদের আড্ডাস্থলে প্রবেশ করতেন, তাঁর হাঁটু থেকে কড়কড় শব্দ হত, তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসতো। তিনি নিজে নিজেই বিড়বিড় করে কথা বলতেন। বাড়ির চারপাশে হাঁটা চলাফেরা করার সময় তিনি কোনও মোজা পরতেন না, বাইরে গেলে তিনি কাঠের-হিলের জুতো এবং গোড়ালিতে মোজা পরতেন; এতে তাঁর পায়ের শিরাগুলি ফুলে নীল বর্ণ ধারণ করতো। আমি লোনির সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম যাতে তার দৃষ্টি যতটা সম্ভব আমার মায়ের কাছ থেকে সরিয়ে নেয়া যায়।

লোনি নম্র ও প্রশংসাজনক অভিব্যক্তি প্রকাশ করল যা গুরুজনদের উপস্থিতিতে ছিল তার ছদ্মবেশ। আমার মা আমাদের দেখে হাসলেন যা ছিল ভয়ঙ্কর সুন্দর। আমার মা আমাকে টেনে নিয়ে গেলেন।তিনি আমাকে দূরে নিয়ে গিয়ে ঘুরিয়ে দাঁড় করালেন। তিনি মুখের মাঝে পিনগুলি রেখে লোনিকে জিজ্ঞাসা করলো,”তুমি কি চিন্তা করছো?” লোনি মৃদু ও আন্তরিকভাবে বলেছিল, “সুন্দর।” লোনির নিজের মা মারা গিয়েছে। সে তার বাবার সাথে বসবাস করেছে যিনি লোনির দিকে লক্ষ্য রাখেন না। আমার দৃষ্টিতে লোনীর বাবা সমালোচিত ও সুবিধাবাদী।

আমার মা বলেন, “আমি যদি কখনও তাঁকে কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করে তোমাদের দুজনের সম্পর্কের সমন্বয়সাধন করতে পারি তাহলে খুব ভাল হবে”। আমার মা লোনির সাথে এমনভাবে কথা বলছিলেম যেন লোনি অনেক বড় হয়েছে আর আমি এখনও অবুঝ শিশু। “স্থির থাকো,” বলে তিনি আমার মাথার উপরে পিনযুক্ত এবং অল্প সেলাই করা পোশাকটি রাখলেন।আমি কিছুটা যন্ত্রণা অনুভব করি।আমি লোনির মত উজ্জ্বল ফর্সা এবং পাতলা দৈহিক গঠনের অধিকারী হওয়ার জন্য ইচ্ছা পোষণ করি। আমার মা বলেন, “আমি যখন স্কুলে যেতাম তখন কেউ আমাকে জামা তৈরি করে দেয়নি। আমার নিজের জামা নিজেকেই তৈরী করতে হত।

আমি দীর্ঘ সাত মাইল পথ পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতাম”। আমার মায়ের এই সংগ্রামী জীবনের গল্প আমাকে প্রথমদিকে আমাকে আগ্রহী করে তুললেও কিছুক্ষণ পর তা আমার কাছে অতিনাটকীয়,অপ্রাসঙ্গিক এবং বিরক্তিকর মনে হল। তিনি বলেন, “একবার আমাকে একটি জামা দেয়া হয়েছিল,”এটি ক্রিম রঙের কাশ্মিরের উলের মত ছিল যার সামনের বোতামগুলি ছিল রাজকীয় নীল মুক্তোর মত, একথা শুনে আমি অবাক হচ্ছিলাম। এর কিছুক্ষণ পর আমি লোনিকে উপরের তলায় আমার ঘরে নিয়ে যাই। ঠান্ডা ছিল, কিন্তু আমরা সেখানেই থাকলাম। আমরা আমাদের ক্লাসের ছেলেদের সম্পর্কে কথা বলি, “তুমি কি কাওকে পছন্দ করো? আচ্ছা, তুমি কি কাওকে অর্ধেক পছন্দ কর? তাহলে তুমি কি কাওকে ঘৃণা কর?

আচ্ছা কেও যদি তোমাকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে যাওয়ার জন্য বলে তুমি কি তার সাথে যাবে? “যদিও এখন অবধি কেও আমাদের এমন প্রস্তাব দেয়নি তা ভেবে আমি মুচকি হাসলাম। তখন আমরা দুজনই তেরো বছর বয়সী এবং আমরা দুই মাস ধরে উচ্চ বিদ্যালয়ে যাচ্ছি। আমাদের ব্যক্তিত্ব আছে কি না? এবং আমরা জনপ্রিয় হব কিনা? তা অনুসন্ধান করার জন্য আমরা ম্যাগাজিনগুলির নিবন্ধের নিচে দেয়া ঠিকানায় প্রশ্ন করি। আমরা ম্যাগাজিনে রূপ ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি নিয়ে অনেক অনুচ্ছেদ পড়েছি।প্রেমিকের সাথে প্রথম দিন কীভাবে কথোপকথন শুরু করতে পারি এবং কোন ছেলে যখন প্রেমের সম্পর্ক ছিন্ন করে যখন খুব দূরে যায় তখন কী করা উচিত সে বিষয়গুলো নিয়েও আমরা নিবন্ধ পড়ি। এছাড়াও আমরা মেয়েদের ঋতুজরা, গর্ভপাত এবং সংসার জীবনে স্বামী স্ত্রীর কলহ বিবাদ ও প্রতিকার সম্পর্কিত নিবন্ধগুলিও পড়ি।

যখন আমরা স্কুল শিক্ষকদের দেয়া বাড়ির কাজ করতাম না, তখন বেশিরভাগ সময় আমরা যৌন তথ্য সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতাম। আমরা একে অপরকে সব কিছু বলার জন্য একটি চুক্তি করেছিলাম। তবে একটি বিষয়ে আমি লোনিকে জানাই নি আর তা হল আমাদের স্কুলে বড়দিন উপলক্ষে যে নৃত্যানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে তার জন্য আমার মা আমাকে একটি লাল জামা বানিয়ে দিচ্ছেন। এর কারণ আমি সেই অনুষ্ঠানে যেতে চাই না।

বাংলা অনুবাদক: পলাশ মাহবুব ইংরেজি বিভাগ;
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা মোকাবিলায় প্রস্তুত চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ করোনা সংক্রমণের প্রথম ধাপের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যকে গতিশীল রাখতে ভাইরাসটির দ্বিতীয় ধাক্কা মোকাবিলায় প্রস্তুত...

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক প্রয়োজন: সিবিআইআর

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক প্রয়োজন বলে মনে করে ভারত-বাংলাদেশ...

ইসলামভিত্তিক শক্তিশালী সমাজ গঠনে আশাবাদী এরদোয়ান

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ পশ্চিমাদেশগুলোতে ইসলামবিদ্ধেষ অব্যাহতভাবে বৃদ্ধির প্রসঙ্গ ‍তুলে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইপ এরদোয়ান বলেছেন, মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে অসম্মানের সঙ্গে...

দুই গাড়ি সরকারকে ফেরত দিলেন ওবায়দুল কাদের

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপির অনুকূলে পরিবহন পুল থেকে টয়োটা...

Recent Comments