সামাজিক বৈষম্য ও দুর্নীতির কারণে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়

0
424
সামাজিক বৈষম্য ও দুর্নীতির কারণে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়
একজন খেটে খাওয়া কৃষকতার প্রাপ্য নায্যমূল্য পেয়ে প্রত্যেক স্তরের ব্যবসায়ীদের নির্ধারিত মূল্যে চার্ট থাকা প্রয়োজন।

জিসান তাসফিক: ইদানিং কালে বাংলাদেশে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের দাম অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাধারণত সমাজে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়। তখন দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়া সমাজের একটি স্বাভাবিক বিষয়। যে জিনিসের মূল্য হাজার বছর পূর্বে যেমন ছিল বর্তমানে তেমন নাই। নানান কারণে এটা হতে পারে। সাধারণত মূদ্রা স্ফীতি হলে, চাহিদা বেড়ে গেলে, যোগান কম হলে দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়। কিন্তু কখনও কখনও অস্বাভাবিক ভাবে দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়। সেটা হতে পারে সামাজিক বৈষম্যের ফলে কিংবা অসাধু ব্যবসায়ীদের দুর্নীতির জন্য। সেটা যদি নিত্য প্রয়োজনী দ্রব্য হয় তবে সাধারণ জনগণের জন্য বিষয়টি দুঃখজনক হয়ে থাকে।

নিত্য প্রয়োজনী দ্রব্যের মধ্যে খাদ্যদ্রব্য অন্যতম। মানুষের পাচটি মৌলিক চাহিদা আছে। এই পাচটি মৌলিক চাহিদা পূরণ হলে মানুষ সুষ্ঠু ও সুন্দর ভাবে জীবন-যাপন করতে পারবে। তার মধ্যে অন্যতম হল খাদ্য। খাদ্য ছাড়া মানুষের একদিন চলে না। আমাদের বাংলাদেশের মানুষের ক্ষেত্রে খাদ্য তালিকায় অন্যতম জিনিসগুলো হল চাল,ডাল, মাছ, মাংস, আলু, তৈল, মসলা জাতীয় দ্রব্য, শাকসবজি ইত্যাদি। বলা চলে ধনী থেকে গরীব সবাই তার আয়ের মধ্যে এইগুলো কিনে খেতে পারে। কিন্তু যখন এর মধ্যে এগুলোর দাম বৃদ্ধি পেলে মধ্যবিত্ত আর গরীবেরা বিপাকে পরে। পিয়াজ সংকটে পিয়াজের দাম আকাশ চুম্বি বৃদ্ধি পায় আবার কিছুদিন যাবৎ আলু দাম অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পয়েছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর কতৃক আলুর দাম সর্বোচ্চ ৩০ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটা সাধারণ জনগণের জন্য স্বস্তির সংবাদ। কিন্তু মাঠপর্যায় এর বাস্তবায়ন ও জরুরি। এছাড়া খুজেঁ বের করা প্রয়োজন বাংলাদেশে মাঝে মাঝে অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির পিছনের রহস্যেগুলোকে।

অর্থনীতিতে বলা হয় চাহিদা বাড়লে মূল্য বাড়ে। কিন্তু সেখানে যদি পর্যাপ্ত যোগান থাকে তাহলে দাম বাড়ার কথা নয়। বাংলাদেশ কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কতৃক প্রকাশিত তথ্য বলতেছে বাজারে পর্যাপ্ত আলু রয়েছে। তাহলে মূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি স্বাভাবিক আসেই না বরং সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। অনেক সময় গনমাধ্যম হতে জানা যায় যে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীগন রয়েছে যারা অতিরিক্ত মুনাফার লোভে বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য সরবরাহ করে না আবার বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে দাম বৃদ্ধি করে। যার প্রভাব এসে পরে খেটে খাওয়া জনগণ সহ অনেকের উপর। এর প্রভাবে আইনশৃঙ্খলা অবনতি হয়। লোভে পরা মানুষের লোভ কমানো যায় কিন্তু পেটের দায়ে চুরি করে তাহলে কোনো উপায় নাই। কারণ পেটে খাবার না আসলে নীতি বাক্য কাজে আসে না। বাংলাদেশের পূর্বে ঘঠে যাওয়া দুর্ভিক্ষই তার প্রমাণ। শুধুমাত্র অসাধু ব্যবসায়ীদের দায়ী করা হলে সেটাও ভুল হবে।

সমাজের প্রতিটি মানুষ চায় আরামদায়ক জীবন পেটে। যত কম পরিশ্রমে এটা সম্ভব হয় তত ভালো। ধনী গরীবের বৈষম্য এদেশে এখনো বিদ্যমান। তার অন্যতম কারণ হল অর্থ ও প্রতিপত্তি। সারাদিন মাঠে ঘাটে কাজ করে দিনে শেষে ৫০০-৭০০ টাকা আয় করে যখন দেখে অল্প পরিশ্রম করে হাজার হাজার টাকা পায় তখন তারও ইচ্ছা জাগে বেশি আয় করার। এছাড়াও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে অনেকর ফসলি জমি নষ্ট হয়, অনেকে ঋণ জর্জরিত থাকে আবার সবার ভালো ফলন হয় না। তখন সেটি পুষিয়ে নেয়ার জন্য ও মজুরি ও পাইকারি বৃদ্ধি পায় । বেশীর ভাগ সময় দেখা যায় যে ধানের জন্য কৃষকেরা পর্যাপ্ত দাম পান না এবং এর কিন্তু বাজারে চালের দাম কমে না ফলে কৃষকেরা আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নেবার জন্য দাম বৃদ্ধি করতে পারেন। বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তির যুগ তাই কোনো কিন্তু কারও অগোচরে থাকে না। সঠিক অনুসন্ধানের প্রয়োজন।

অস্বাভাবিক ভাবে দ্রব্য মূল্য বৃদ্ধি রোধ এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন নীতিমালা আছি। এগুলোর মধ্যে ‘দ্য এসেনশিয়াল আর্টিকেলস অ্যাক্ট ১৯৫৩’, ‘কন্ট্রোল অব এসেনশিয়াল কমোডিটি অ্যাক্ট ১৯৭৬’, ‘অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যাদি নিয়ন্ত্রণ আদেশ ১৯৮১’ ‘অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বিপণন ও পরিবেশক নিয়োগ আদেশ ২০১১। ভোক্তাদের জন্য রয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯। সমন্বিতভাবে ভোক্তা অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ নিয়ে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয় । গণমাধ্যমের বিভিন্ন সংবাদে দেখা যায় যে বিভিন্ন জায়গা এসব ব্যবসায়ীদের হাতে নাতে ধরে অর্থদণ্ড দিয়েছে। কিন্তু তবুও থামে না। ভ্রাম্যমাণ আদালত চলে গেলে আবার শুরু হয়। বলা সম্পূর্ণ বাজার কতিপয় কিছু অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে থাকে। এখানে মাঠ প্রশাসনের তদারকিই যথেষ্ট নয় বরং ভোক্তার তথা জনগণকে দ্রব্যমূল্যের বিষয়ে সচেতন হতে হবে এবং প্রশাসনকে সাহায্য করতে হবে।

একজন খেটে খাওয়া কৃষকতার প্রাপ্য নায্যমূল্য পেয়ে প্রত্যেক স্তরের ব্যবসায়ীদের নির্ধারিত মূল্যে চার্ট থাকা প্রয়োজন। মাঠ প্রশাসন দ্বারা এ সুষ্ঠু তদারকির প্রয়োজন আছি। এক্ষেত্রে জনগণের পক্ষে স্থানীয় সরকার প্রশাসন ও সহযোগিতা করতে পারে। আমাদের সমাজে বৈষম্যে মূলক আচরণের ফলে সবার মধ্যে বিত্তশালী হবার ইচ্ছা জাগে। যার ফলে অনেকই চায় অল্পতে অতিরিক্ত মুনাফা লাভ করার। সেটা থেকে বেড়িয়ে আসা প্রয়োজন। এতে করে অনেক দুর্নীতি কমে যাবে। এছাড়া শ্রমের উপর মান বন্টনের ও প্রয়োজন আছি। একজন মানুষ অল্প কাজে অধিক আয় অন্যকেও অধিক আয়ের জন্য আগ্রহ বাড়াতে পারে। সব স্তরের ও সব পেশার মানুষ নায্য অধিকার ও সম্মান পেলে দুর্নীতি সহ অনেক অপরাধ কমিয়ে আনা সম্ভব।

লেখক: জিসান তাসফিক
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ;
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here